Home / ভিডিও / বিক্রেতারা এসব ওষুধকে ‘পাওয়ার’ বলে … বিস্তারিত পরুন …

বিক্রেতারা এসব ওষুধকে ‘পাওয়ার’ বলে … বিস্তারিত পরুন …

উত্তেজক ট্যাবলেটে – যৌন উত্তেজক ওষুধে ঝুঁকছে যুবকরা। আর এতে কাবু হচ্ছে তারা। গোপনে চলছে আমদানি ও বিপণন নিষিদ্ধ এসব উত্তেজক ওষুধের বাণিজ্য। বিভিন্ন চোরাপথে দেশের বাজারে আসছে এসব ওষুধ। বিক্রেতারা এসব ওষুধকে ‘পাওয়ার’ বলে অভিহিত করছেন। এসব পাওয়ারের মধ্যে ‘ইয়াবা’ নিয়ে দেশে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলেও অন্যান্য ওষুধ নিয়ে নেই তৎপরতা। এসব ওষুধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছু অভিযান চালালেও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

‘যৌন উত্তেজক’ বলে প্রচার করা অনুমোদনহীন দেশীয় ওষুধের বাজারও বাড়ছে। তবে স্বাস্থ্য ও মাদকবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওষুধ এক ধরনের মাদক। আসক্তি বাড়ানো ওষুধগুলো শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিভিন্ন ফার্মেসির বিক্রেতারা জানান, বাজারে ভারতের ইন্টাগ্রা’ ৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। আমেরিকার ভায়াগ্রার প্রতি ট্যাবলেটের মূল্য ৭৫০ টাকা। ভারতের সেনেগ্রা ও কামাগ্রা প্রতি ট্যাবলেট ৫০ থেকে ৭০ টাকা। সেনেগ্রা, টেনেগ্রা, ফরজেস্ট, ক্যাবেটরা, টার্গেট ও ইডেগ্রা বেশি বিক্রি হচ্ছে বলে জানান বিক্রেতারা। অধিকাংশ ওষুধের গায়ে মূল্য, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ লেখা থাকে না। আমেরিকার টাইটানিক এক বোতলের দাম চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। খুচরা ট্যাবলেট ৪০০ টাকা।

টাইটানিকে ইয়াবার মতো উত্তেজনার পাশাপাশি নেশা হয়। তাই ইয়াবার ক্রেতারা কেউ কেউ টাইটানিক সেবন করছেন। কম দামে পাওয়া যাচ্ছে চীনের জিয়ংবার। একটি ট্যাবলেটের দাম ৭০ টাকা। জিনসিন পাস ৯০০ টাকার দরে বিক্রি হয়। পাওয়া যাচ্ছে দেশে তৈরি উত্তেজক ওষুধও। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ঢাকা ও সারা দেশের খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা রাজধানীর মিটফোর্ড ও চানখাঁরপুল থেকে দেশি-বিদেশি উত্তেজক ওষুধ কিনে এলাকায় চড়া দামে বিক্রি করছেন। খুচরা বিক্রেতারা এসব ওষুধকে পাওয়ার বলে ডাকেন। অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে তারা পাওয়ারও নিয়ে নেন প্রয়োজনমতো। শাহবাগ, ধানমন্ডি, শেরে বাংলানগরসহ সবখানেই পাওয়ার খুচরা বিক্রি হচ্ছে। মিটফোর্ডের কয়েকজন ওষুধ বিক্রেতা জানান, সরদার মার্কেটকে বলা হয় ইন্ডিয়ান মার্কেট।

এ মার্কেটের নিচতলার দোকানগুলোতেই পাওয়ার ওষুধ বেশি বিকিকিনি হয়। এ ছাড়া হাবিব মার্কেটসহ সব মার্কেটে এখন উত্তেজক ওষুধ বিক্রি হয়। রাজধানীর অভিজাত এলাকার ওষুধের দোকানেই বিক্রি বেশি। উচ্চবিত্ত শ্রেণির যুবক-যুবতীরা এসব ওষুধ খাচ্ছে। কিছু উত্তেজক ওষুধ খেলে চেহারার লাবণ্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়। এ কারণে শখ করে খায় অনেকে। উত্তেজনার পাশাপাশি নেশার কারণে ইয়াবা বেশি প্রচলিত হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আইসপিল, ভায়াগ্রা, সানাগ্রা, ইন্টাগ্রাসহ বিভিন্ন ওষুধে আসক্ত হয়ে পড়েছে যুবসমাজ। এক শ্রেণির অপচিকৎসায় এ ধরনের ওষুধের মাধ্যমে যৌন দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা চালানো হয়। ওই সব কথিত চিকিৎসক এ ধরনের ওষুধ-বাণিজ্যের সিন্ডিকেটেও জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, গত দু’বছর আগে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন লাগেজ আমদানি-নিষিদ্ধ ওষুধ আটক করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। তবে লাগেজ বহনকারী সন্দেহভাজন পাকিস্তানি নাগরিক পালিয়ে যায়। ২০০৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকালে কার্গো ভিলেজে পড়ে থাকা পাঁচটি বড় কার্টন কাস্টমস কর্মকর্তারা গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতিতে খুলে দেখেন কয়েক হাজার পিস উত্তেজক ওষুধ। জানা গেছে, কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফ এবং উত্তরাঞ্চলের ভারতের সীমান্ত হয়ে ইয়াবার সঙ্গে উত্তেজক ওষুধের চালান আসে দেশে।

উত্তেজক ওষুধে আসক্ত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে কৌতূহলেই খাওয়া শুরু করেন তারা। ভালো লাগা থেকে এখন আসক্তি ও নেশা। কেউ কেউ বিশেষ শারীরিক ক্ষমতা বাড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করেন। পরে ওষুধ না খেলে তারা স্বস্তি পান না। তবে স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলেন, উপযুক্ত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া কোনো ধরনের উত্তেজক ওষুধ সেবন করা ঠিক নয়। এতে শরীরের স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ জানান, পুরুষ-মহিলাদের মধ্যে ২ থেকে ৫ শতাংশের দুর্বলতা থাকতে পারে। ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশের মানসিক সমস্যা। সে জন্য বিভ্রান্ত হয়ে উত্তেজক ওষুধ খায় অনেকে। এসব ওষুধ হৃদরোগ ও কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন ব্যবহারে দৃষ্টিশক্তি ও স্মৃতিশক্তি কমে যায়। এতে লিভার ও নার্ভ ড্যামেজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

মিটফোর্ডের ওষুধ ব্যবসায়ীরা জানান, ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অভিযানের অভাবেই এসব ওষুধ বিক্রি হয়। তাই অনেকে দোকানে নিষিদ্ধ উত্তেজক ওষুধ রাখেন। বিদেশি আমদানি-নিষিদ্ধ ওষুধের আদলে এখন দেশি কোম্পানি উত্তেজক ওষুধ বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে। ওষুধ প্রশাসন ওই সব ওষুধের অনুমোদনও দিয়ে থাকে। ওষুধ প্রশাসন কর্মকর্তারা বলেন, উত্তেজক ওষুধ হিসেবে যেসব ওষুধ বাজারে বিক্রি হয় তা ভেজাল এবং অনুমোদনহীন। অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেরা তৈরি করে বিদেশি সিল লাগিয়ে দিচ্ছেন। ল্যাবে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ক্ষতিকর সব উপাদান আছে।

র‌্যাব হেড কোয়ার্টারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরওয়ার আলম এই বিষয়ে বলেন, বাজারে নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজক ওষুধের শতকরা ৮০ ভাগই ভারত থেকে আসে। যৌন উত্তেজক সেনেগ্রা ওষুধই বেশি বিক্রি হয় বলে তাদের অভিযানে উঠে এসেছে। এছাড়া দেশি হরবাল ওষুধ জিংসন যৌন উত্তেজক হিসেবে সেবন করছে কেউ কেউ। যদিও এটি কম মাত্রায় অনুমোদন নিয়ে উচ্চমাত্রার শক্তি বর্ধন করে বিক্রি করছে কিছু কোম্পানি। তিনি জানান, দু-তিন মাস আগে যাত্রাবাড়ী এলাকায় জিংসন যৌন উত্তেজক ওষুধ উৎপাদনকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে র‌্যাব’র অভিযানের কারণে আগের চেয়ে পরিস্থিতি একটু কমে এসেছে বলে এই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন। তিনি আরও জানান, র‌্যাব গত প্রায় এক বছরে অভিযান চালিয়ে যৌন উত্তেজক ওষুধ রাখার দায়ে ৪০ থেকে ৬০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাবেক এক নেতা বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী প্রকাশ্যেই উত্তেজক ওষুধ বিক্রি করেন। কেউ কেউ অকারণে ব্যবহার করছে এই ওষুধ। আগে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে আসলেও এখন ভারত থেকেই বেশি আসছে যৌন উত্তেজক ওষুধ। নীতিমালা নেই। ক্রেতা-বিক্রেতার সচেতন হওয়া উচিত। ঢালাওভাবে বিক্রি করা উচিত নয়। এই ওষুধ ব্যবহারে কঠিন হওয়া উচিত বলে এই নেতা মনে করেন। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা যাবে না।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)’র মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, কোনো ওষুধই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া উচিত নয়। ইদানীং দেশে যুব সমাজের মধ্যে যৌন উত্তেজক ওষুধ সেবনের মাত্রা বেড়ে গেছে। এতে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। হতে পারে জটিল রোগও। তাই এই ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

About Admin Rafi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *