Breaking News

শাসক দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বরাবরই সাহিত্যের ভাষায় কথা বলেন। ছাত্র জমানা থেকেই বাংলা সাহিত্যের উপর তার ঝোঁক রয়েছে। সাহিত্যের পরিমণ্ডলে থেকেই তিনি রাজনীতির ভাষা খুঁজেন। করোনাকালে এই চর্চা আরো বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই মিডিয়ার সামনে তিনি হাজির হন। নানা চমকপ্রদ তথ্য হাজির করেন। করোনা জয়ে জনগণকে সতর্ক করেন। যেহেতু সভা সমাবেশ বন্ধ তখন ভার্চুয়ালই একমাত্র পথ। শব্দের বাহাদুরিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা, মন্দ লাগেনা। করোনার যৌবনকালে একদিনে ১৯ টি ছবি পোস্ট করে তিনি খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন।

আর বিরোধী বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সময়ে কি করছেন? হঠাৎ হঠাৎ তিনি ভার্চুয়াল মিডিয়ায় হাজির হচ্ছেন। তাও লক্ষ্যহীন। তার দল কি চায় তা বোধকরি তিনি জানেনই না। তার অগোছালো, লক্ষ্যহীন কথাবার্তা শুনলে যে কেউ এটা বুঝতে পারবেন। এজন্য রাজনীতির পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই।
প্রায় ১৪ বছর যাবৎ দলটি ক্ষমতার বাইরে। এরমধ্যে তিনটি নির্বাচন হয়ে গেল। কোনো নির্বাচনেই ফায়দা তুলতে পারেনি দলটি। কারণ ভুল নীতি কৌশল। নির্বাচনেতো জয় পরাজয় থাকবেই। অন্তত আমাদের মত দেশে। যে দেশে ক্ষমতা যার, নির্বাচন তার। এটাই অনেকটা প্রচলিত রীতি। এতে কেউ সফল, কেউ ব্যর্থ। তবে এই সরকার শতভাগ সফল। অন্তত নির্বাচনী রাজনীতিতে। এ নিয়ে বিতর্কের কোন সুযোগ নেই। বিএনপি কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে? সাধারণভাবে বলা যায় সরকারের কৌশল সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকা। ধরা যাক ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা। গ্রাউন্ড তাদের পক্ষে। ৫টি সিটি নির্বাচন জিতে এসেছে। মিডিয়াও ঘুরে গেছে। জনগণতো পরিবর্তনের পক্ষে। এমন অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলে বয়কটের পথে গেল বিএনপি। সরকার যে টলবে না এটা বুঝতেই পারেনি। এরমধ্যে সংলাপের ঐতিহাসিক সুযোগটি হাতছাড়া করলো। রাজনীতির পরিভাষায় এটাকে ‘সুইসাইড’ বলা হয়ে থাকে। সংলাপ ছেড়ে গেল আন্দোলনে। কিন্তু এতে সফলতা এলো না। এর মূল কারণ কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত। চোখের সামনে বাস পুড়ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে। দলটি দেখেও চুপ থাকলো। সব দায়ভার চাপলো তার ওপর। একবারও দাবি তুললো না কারা এসব করেছে। নিজেরাও তদন্ত করে দেখলো না। আগুন সন্ত্রাসের তকমা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। নির্বাচনী লড়াইয়ে জয় পরাজয় নির্ধারিত হলো না। বিনা ভোটেই জয় তুললো আওয়ামী লীগ।

প্রয়াত সেনা কাম রাজনীতিক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ কেন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন তাও তলিয়ে দেখলো না। ব্যর্থ হলো আঞ্চলিক রাজনীতির মোড়লদের মনোভাব বুঝতে। প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে কি সুবিধা পেল দলটি তা অজানাই থেকে গেল। যদিও এজন্য চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এসব বুদ্ধি পরামর্শ কারা দিয়েছিল তাদের মতলব সম্পর্কেও সজাগ ছিল না দলটি। অকাতরে নিজের সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনল। গত নির্বাচনের আগে ড. কামাল হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা করল। নাটকীয়ভাবে সংলাপে যোগ দিল। এসবই ছিল ইতিবাচক দিক। ভুল করেই মানুষ শিখে। ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে পরাজয় জেনেও বয়কটের পথে যায়নি। নির্বাচন বয়কট বোকামি ছাড়া কিছু নয়। রাষ্ট্রীয় শক্তির কাছে সবসময় কি জয়ী হওয়া যায়? দেশে দেশে ব্যর্থতার নজিরই দেখছি। কেবল মাত্র বসন্তের হাওয়াই পারে বদলাতে। নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণায় শাসক মহলে দুশ্চিন্তা বাড়লো। কারণ দেশি বিদেশি মহল তখন সক্রিয়। আসন নিয়ে পর্দার আড়ালে কথা চললো। একধরণের সমঝোতার মধ্যে হঠাৎ করে দৃশ্যপট বদলে গেল। বিগড়ে গেল অন্যপক্ষ। জামায়াতকে ২৫ আসন তুলে দিয়ে বিএনপি তৃতীয় বারের মত আত্মহত্যা করলো। ইউরোপীয় ইউনিয়নও মত পাল্টালো। তারা সব সময়ই এই শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে এক ধরণের সমঝোতায় রাজি ছিল। কিন্তু জামায়াত প্রশ্নে তারা ছিল অনড়। অন্য এক পক্ষ আগে থেকেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ঝুঁকিতে না গিয়ে তারা রাতের আধারেই কাজটি সেরে ফেললো। ফের মৃত্যু হলো ভোটের। দাবার ঘুঁটি চলে গেল অন্য পক্ষের হাতে। তারা জানান দিল এখন থেকে আমরাই এই অঞ্চলে খেলবো। পরাজিত পক্ষটি এখন আফসোস করছে। বলছে, সেদিনের ভুলের মাশুল দিতে হবে। বিএনপি এটাও বুঝতে পারেনি। এখনও কি পারছে? বল এখন অন্যদিকে গড়াচ্ছে। আঞ্চলিক ভু-রাজনীতিতেও আসছে অনেক পরিবর্তন। এতকিছুর পরেও অবস্থান পরিবর্তন না করে এক রহস্যজনক কারণে সেই শক্তিকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। মজার ঘটনা হলো আমরা এক অদ্ভুত দেশের বাসিন্দা। হেফাজতের হাত ধরেও সেক্যুলার থাকা যায়। এতে করে নিকট ভবিষ্যতে কোন সুবিধাই পাবে বলে মনে হয়না। রাজনীতি আবেগের মতই। গভীর সমুদ্রে তৈরি হয়। অনেকটা ঢেউয়ের মতই। এক জায়গায় স্থির থাকলে চলে না। বারবার কৌশল বদলাতে হয়। বলাবলি আছে বিগত নির্বাচনের আগে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব নিয়ে পর্দার আড়ালে কথা চালাচালি হয়েছিল। যথারীতি প্রত্যাখ্যান করেছে একই কৌশলে। এটা যেন একধরনের অসুখী আক্রোশ। বিএনপি কিভাবে চলে, কারা চালায় এটা কেউ জানেনা। দলটির ভেতরে অন্যপক্ষের শেয়ার হোল্ডার বেশি এমনটাই বলা হয়ে থাকে। মাঝখানে গুঞ্জন দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডন চলে যাচ্ছেন। সংবাদ মাধ্যমেও এ খবরটি এলো। পরে দলটির তরফে বলা হলো সঠিক নয়। অনুসন্ধানে জানা গেল বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ এ খবরটি চাউর করেছিলেন কানে কানে। তাদের উদ্দেশ্য কি? তারা কি জানতেন না কতিপয় শর্তে তিনি জেল থেকে বের হয়েছেন! এই শর্তের ব্যত্যয় ঘটাতে হলে দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। সেই সমঝোতার আগেই তারা খবরটি রটিয়ে দিল।

যাইহোক, সরকারের ভেতরে সংকট আরও সর্বগ্রাসী। করোনা মোকাবিলায় নিশানা ঠিক করতে না পারায় লেজে গোবরে হয়ে গেছে সবকিছু। চীনা বিশেষজ্ঞরা বলে গেছে বাংলাদেশ দিশা না পেয়ে অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছে। সময়মত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। লকডাউন লকডাউন খেলা না খেললে হয়তো অল্পতেই রাশ টানা যেত। অর্থনীতি বাঁচাতে গিয়ে মানুষের জীবন এখন হুমকির মুখে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বেহাল দশা দেখেও কোন পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছেনা। পুরনো সহকর্মী সাহসী কলম যোদ্ধা পীর হাবিবুর রহমান ব্যর্থ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অব্যাহতি চেয়ে নিবন্ধ লিখেছেন। তার লেখায় মুনশিয়ানা আছে। কিন্তু কে নেবে ব্যবস্থা। অতীত অভিজ্ঞতা বলে ব্যর্থরাই টিকে থাকেন। অভিজ্ঞ আর দক্ষরা আগে ভাগেই বিদায় নেন। ব্যর্থতা নেই কোথায়? টাকা লুট হচ্ছে। টাকা বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছে। টিআইবির দেয়া তথ্যমতে, প্রতিবছর ২৬ হাজার চারশো কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। কোনো বিচার হয়নি। কোনো উদ্যোগও নেই। মেগা প্রকল্পে মেগা দুর্নীতির খবর এখন মুখে মুখে। ক্যাসিনোকাণ্ডে আমরা সবাই প্রত্যক্ষ করলাম। সমালোচকদের কন্ঠ চেপে ধরতে যে দক্ষতা দেখানো হচ্ছে তার শিকিভাগও যদি ব্যর্থতার আমলনামা পরখ করে দেখা হতো তাহলে মনে হয় সংকট গভীর হতো না। তাহলে হয়তো দেশ বেঁচে যেত। আমরা উন্নয়নের জয়গান গাইতে পারতাম। কে না জানে সবকিছুরই একটা বিজ্ঞান আছে। বিজ্ঞানের বাইরে সমাধান খুঁজলে বিপর্যয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। রাষ্ট্রে কি না হয় তা নিয়ে ক’জন ভাবে! সবাইতো অন্ন চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত। কারণ অন্ন চিন্তা অন্য সব চিন্তাকে ভুলিয়ে দেয়। করোনা বিশ্বমানচিত্রে পরিবর্তন এনে দিয়েছে। রাজনীতিও বদলে যাবে এমনটাই স্বাভাবিক। আমরা এখন একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত তা হলো ‘নিউ নরমাল’।

About Saimur Rahman

Leave a Reply