
গ্রীষ্ম-বর্ষা, ঝড়-বৃষ্টি, তুফান-কোনো কিছুতেই বিরতি নেই, বছরজুড়ে রাতদিন চলছে ট্রেন। সেই ট্রেনের স্টিয়ারিংয়েও নারীর হাত পড়েছে। শক্ত হাতে ট্রেন চালিয়ে প্রতিদিন গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন হাজার হাজার যাত্রী। সংখ্যায় তারা ১৯ জন। নাম ‘নারী ট্রেনচালক’। শুধু সাহস নয়, মেধা আর দক্ষতায় নিজেদের এ পদে যোগ্য করে তুলেছেন। শুরুতে পথটা কঠিন হলেও ধীরে ধীরে মসৃণ হচ্ছে। যোগ্যতা দিয়ে তারা কাজটি সহজ করে নিয়েছেন। ফলে মিটার বা ব্রডগেজে এক্সপ্রেস বা লোকাল ট্রেন, কোনো কিছুতেই ক্লান্তি নেই। দীর্ঘতম এ যন্ত্রযান নিয়ে অবিরাম ছুটে চলেছেন। এর ফলও পাচ্ছেন। তাদের বীরত্বের প্রশংসা এখন রেল এবং রেলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৪ সালে প্রথম নারী ট্রেনচালক হিসাবে যোগদান করেন ছালমা খাতুন। সেই শুরু। এরপর ২০১১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়েতে ১৮ জন নারী চালক যুক্ত হন। আরও কিছু নারী চালকের নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। তারা শত শত পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে যোগ দিয়েছেন সহকারী ট্রেনচালক পদে। রেলপথমন্ত্রী বলছেন, ট্রেনচালকদের মধ্যে নারী বা পুরুষে কোনো বৈষম্য নেই। রেলে আরও নারী যোগদান করে ট্রেন চালাবে। তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, আমাদের মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এখনকার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ট্রেন চলবে। বর্তমান সরকার রেলে ব্যাপক উন্নয়ন করছে। রেলে আরও নারী চালক নিয়োগ হবে। নারী চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে আমরা কাজ করছি। নারীরা নিজ যোগ্যতায় এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রেন পরিচালনায় তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয়।
আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘টেকসই আগামীর জন্য জেন্ডার সমতাই আজ অগ্রগণ্য’। ২০০৪ সালের ৮ মার্চ রেলে প্রথমবারের মতো নারী ট্রেনচালক হিসাবে যোগদান করেন ছালমা খাতুন। এই নারী দিবসেই রেলে নারী ট্রেনচালকের অধ্যায় শুরু। প্রথমে এএলএম-২ (সহকারী ট্রেনচালক-গ্রেড ২) হিসাবে যোগদান করেন ছালমা।
বর্তমানে তিনি এলএম (ট্রেনচালক)। পুরোদমে এক্সপ্রেস থেকে মেইল, লোকাল ট্রেন চালিয়ে যাচ্ছেন। দিবসটি ঘিরে রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জন নারী ট্রেন চালকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ছালমা খাতুন জানালেন, চাকরির বয়স এখন ১৯ বছর। চাকরি করা অবস্থায় বিএসএস, ডিএড এবং মাস্টার্স পাশ করেন। তার পরে আসা ১৮ জন নারী চালকের সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ রাখেন। এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগান।
প্রায় সোয়া ৪ হাজার কিলোমিটার রেলপথে ১৯ নারী ট্রেনচালকের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে। পূর্বাঞ্চলে ৯ এবং পশ্চিমাঞ্চলে ১০ জন ট্রেন চালান। রেলপথমন্ত্রী, রেলওয়ে সচিব, অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (রোলিং স্টক) সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নারী ট্রেনচালকরা অত্যন্ত দায়িত্বশীল। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু ট্রেনচালক নন, রেলে নারীরা সর্বোচ্চ পদে আসবেন-এমনটাও তাদের আশা।
নারী চালকরা জানালেন শুরুতে ইঞ্জিনে উঠতেই ভয় পেতেন। সামনে তাকালে মনে হতো, এই বুঝি ট্রেনটি পড়ে যাচ্ছে, আর দাঁড়াবে না। দিনদিন সাহস সঞ্চয় করে এখন যথাযথ গতি নিয়ে ট্রেন চালাচ্ছেন তারা। তাদের মধ্যে একজন কুলসুম আক্তার। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেনও চালান। রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ থেকে গণিতে অনার্স, মাস্টার্স করে ট্রেনচালকের চাকরি নিয়েছেন। জানালেন, খুবই চ্যালেঞ্জিং পেশা এটি। উনিশ থেকে বিশ হলেই মহাবিপদ। প্রায় ৯০ ভাগ কাজই ম্যানুয়াল এবং মেধা খাটিয়ে করতে হয়। চালকের কাঁধেই থাকে শত শত যাত্রীর প্রাণ।
পূর্বাঞ্চল রেলে ছালমা খাতুন, কুলসুম আক্তার ছাড়াও রেহনা আবেদীন, খুরশিদা আক্তার, উম্মে সালমা ছিদ্দিকা, সালমা বেগম, সাজেদা খানম, লেজী আক্তার, কহিনূর আক্তার ও আকলিমা সুলতানা ট্রেন চালাচ্ছেন। রেহেনা আবেদিন ২০১১ সালে যোগদান করেন। সংসারে ১ ছেলে ১ মেয়ে। অনেক সময় ভোরে, কখনো মধ্যরাতেও ট্রেনে থাকতে হয়। শরীরে ক্লান্তি থাকলেও চোখ বন্ধ করার সুযোগ নেই। খুরশিদা আক্তারের ভাষ্য, নারী শক্তির বিকাশের লক্ষ্যেই এ পেশায় আসা।
সালমা বেগম ২০১১ সালে যোগদান করেন। কাজের ধরন না জেনেই তার যোগদান। যখন ইঞ্জিনে উঠতেন, আতঙ্কিত হয়ে পড়তেন। এখন সবকিছু আয়ত্তে। চ্যালেঞ্জিং এ পেশাকে গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। পরিবার থেকে সমাজ, সবাই ভালোবাসেন। এতে সাহস আরও বাড়ে। ২০১৯ সালে যোগদান সাজেদা খানমের। বংশে কেউ রেলে চাকরি করেননি। স্বজন, পাড়ার মানুষ তাকে দেখতে আসেন, দেখতে আসেন ‘নারী ট্রেনচালককে’। কহিনূর আক্তারের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। কুমিল্লার মেয়ে। শুরুতে ইঞ্জিন দেখলেই ভয় হতো। এখন পুরো ইঞ্জিনটাই যেন তার নিয়ন্ত্রণে, তার কথা শুনে, চলে।
উম্মে সালমা ছিদ্দিকা ২০১১তে যোগদান করেন। ম্যানেজমেন্টে অনার্স-মাস্টার্স করেছেন। ইচ্ছা ছিল বিসিএস দিয়ে চাকরি করবেন। রেলের পরীক্ষায় পাশ করে ফেললেন। ট্রেন চালাবেন, এমন সাহস ছিল না। রেলের সহকর্মী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় চালানো এখন তার কাছে মামুলি ব্যাপার। লেজী আক্তার ট্রেন চালানোর পাশাপাশি ইঞ্জিনের সমস্যা সমাধানেও কাজ করেন। আকলিমা সুলতানা বললেন, এমন চ্যালেঞ্জিং পেশায় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো খুবই জরুরি। বেতন থেকে পদোন্নতি, পুরো বিষয়েই সংশ্লিষ্টদের নজর বাড়াতে হবে। শুরুতে তৃতীয় শ্রেণির পদে যোগদান, অবসর কালেও সেই পদই! বিষয়টি নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তিনি।
পশ্চিমাঞ্চল রেলে ৯ জন নারী ট্রেনচালক রয়েছেন। তাদের একজন আফরোজা, পড়াশোনা শেষে একটাই ইচ্ছে ছিল-রেলে চাকরি করবেন। ৪ বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। দুই বোন রেলওয়ে অফিস সহকারী পদে চাকরি করেন। আরেক বোন পুলিশবাহিনীতে আছেন। আফরোজার ভাষ্য, রেল সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। হাজারও যাত্রী নিয়ে চালক যখন ট্রেন চালান, তখন বুকে সর্বোচ্চ সাহস চলে আসে। ট্রেন নিয়ে গন্তব্যে পে্যঁছার পর আনন্দের শেষ থাকে না।
বেবী ইয়াসমিন ব্রডগেজ ট্রেন চালান। তার রেলে আসার গল্প ভিন্ন। বড় বাবা (বাবার দাদার), দাদা, বাবাও রেলে চাকরি করতেন। বাবা, দাদার ইচ্ছাই ছিল সে যেন রেলে চাকরি করে। ইঞ্জিনে উঠে ভাবতেন, চলন্ত ট্রেন দাঁড় করাতে পারবে কি না। ট্রেন চালানো খবুই গাণিতিক বিষয়। ইঞ্চি ইঞ্চি সময় মাপতে হয়। নড়চর হলেই দুর্ঘটনা, তাই সর্বদাই সতর্ক থাকতে হয়। ২০১৪ সালে চালক হিসাবে ৫৩ জন যোগদান করেন, যার মধ্যে নারী হিসাবে তিনিই ছিলেন। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে স্মৃতি বললেন, চ্যালেঞ্জ নিতে ভালো লাগে। নারীরা এগিয়ে যাবে। এ পেশায় আরও নারী আসুক।
নাটোরের মেয়ে ফাহমিদা খাতুন। বাবা মারা যাওয়ার পর চাকরি নেন। গর্ব করেন তিনি ট্রেন চালান। তার স্বামীও ট্রেন চালান। স্বামীর কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখেন। শারমীন সুলতানার বাড়ি বাগেরহাট চিতলমারি উপজেলায়। জানালেন, নারীরা ট্রেন চালাচ্ছে বীরের মতো। ট্রেন নিজস্ব পথে চলে। রেললাইন পারাপারে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান। কৃষ্ণা সরকারের বাড়ি নড়াইল জেলায়। ট্রেনচালক হিসাবে নিজের এবং শ্বশুরবাড়িতেও তার বেশ সুনাম। তৌফা খাতুন ২০০৫ সালে খালাসি পদে যোগ দেন। পদোন্নতি পেয়ে তিনি এএলএম হয়েছেন। ফরিদা আক্তার বললেন, খুশির সঙ্গে বিরক্তও তিনি। কারণ পোশাক পরে স্টেশনে প্রবেশ করতেই সাধারণ যাত্রীরা নানান কথা (ভালো-মন্দ) বলেন। ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার সময়ও কেউ কেউ ছবি তুলতে চায়, কথা বলতে চায়। নাসরিন আক্তার পার্বতীপুর রেলওয়ে সেডে কাজ করছেন। বাড়ি ওখানেই। ২০১১ সালে যোগদান। বললেন, নিজেকে খুব ভালো লাগে, যখন ট্রেন চালান। অনেক শক্তিমান মনে হয়। নারী চালকদের আলাদা রানিং রুমসহ ট্রেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান তার।
রেলওয়ে সচিব ড. হুমায়ুন কবির যুগান্তরকে জানান, শুধু ট্রেনচালক নন, রেলে বহু নারী সুনামের সঙ্গে চাকরি করছেন। রেলে উন্নয়ন হচ্ছে, লাইন বাড়ছে। এ পদে আরও নিয়োগ হবে। আমাদের বিশ্বাস, নারী চালকের সংখ্যা অনেক বাড়বে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) মঞ্জুর উল আলম চৌধুরী জানান, নারীরা অত্যন্ত দক্ষ। এগিয়ে যাচ্ছে তারা। প্রশিক্ষণ থেকে ট্রেন চালানো, সব ক্ষেত্রেই তাদের সহযোগিতা করা হয়। তবে এ পদে কোনো বৈষম্য নেই। নারী-পুরুষ সমান। নারীরা আরও আসবে। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তারা ট্রেন চালাচ্ছে।
